1. successrony@gmail.com : Mehedi Hasan Rony :
  2. rj.nazmul2500@gmail.com : Nazmul Hossain : Nazmul Hossain
রবিবার, ২৩ ফেব্রুয়ারী ২০২০, ১১:৪৪ অপরাহ্ন
জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকীর ক্ষণগণনা
৬০দিন
:
০৮ঘণ্টা
:
৩৫মিনিট
:
০২সেকেন্ড

কুবলয়- দ্বিতীয় পর্ব

দিনলিপি নিউজ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ২ ফেব্রুয়ারী, ২০২০
  • ২১ বার

রৌদ্র বিধৌত ঝলমলে একদিন। ভরদুপুর বেলা। জুতোর দোকানে বড়ো আকস্মিক ভাবে প্রেমার সঙ্গে বাঁধনের প্রথম পরিচয়। জুতা ক্রয়ের জন্য সপরিবারে প্রেমারা এলো দোকানে। নিজেদের জন্য অনেক টাকার বিভিন্ন ধরনের জুতো পছন্দ করে কিনেছে তারা। তার মধ্যে ছ’জোড়া জুতো একা প্রেমার।

সে বিলাসী মহিলা সন্দেহ নেই। ধনী ব্যাক্তির বউ। চালচলন এক নজর দেখলেই বোঝা যায়। মেয়েরা বরাবর হিসেবী ও সচেতন হয়।কিন্তু এইসব মেয়েদের হাতে প্রয়োজনের অতিরিক্ত টাকা গেলে তাদের মাথার ঠিক থাকে না। খরচের হাত নিশপিশ করে।

দুপুর বেলা। দোকানে কাস্টোমারের ভিড় নেই। সেলস্ ম্যান রয়েছে ছুটিতে।বাঁধন একাই দোকানের সকল প্রকার দায়িত্বে ছিল।
প্রেমার পছন্দ অনুযায়ী খুঁজে নম্বর মিলিয়ে জুতো নামানো হল একে একে বত্রিশ জোড়া। তার নুপূরপরা লোমহীন সুডৌল পায়ে জুতো পরাতে গিয়ে বাঁধনের মনে পড়ছিল ফিলিপিনের ফাস্ট লেডি ইমেলদা মার্কোসের কথা। ইমেলদার জুতোপ্রীতি একসময় কাগজে ঢালাওভাবে প্রচারিত হয় । এ সর্বজন বিদিত।
প্রেমা সুন্দরী না। শ্যামলা রঙের মধ্যে দারুণ মিষ্টি ও বুদ্ধিমতি মুখ। চাপা নাক, লম্বায় মাঝারি, স্বাস্থ্য ভালো। রীতিমতন মোটাগাটা ফিগার তার। পরনে ছিল টু পীস। নীচে জংলীছাপা সিল্ক কাপড়ের গারারা, উপরে সাদা রঙের টাইট ছোট্ট হাতা হাওয়াই শার্ট। সে একের পর একজোড়া জুতো পায়ে পরে আর দোকানের এমাথা থেকে ঐমাথা মচমচ শব্দ তুলে হেঁটে হেঁটে পরীক্ষা করে নিল । তারপর বাছাই হলে দোকানের লম্বা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে গারারার কাপড় তুলে পুনঃ পুনঃ ঘুরিয়ে ফিরিয়ে পাদুকাদয় দেখলো। অনেকটা বাচ্চাদের ধরন। সত্যি তার অসম্ভব ধৈর্য্য ।
বাঁধন পেছনের থেকে একদৃষ্টে চেয়েছিল। বিষয়টি ছিল অত্যন্ত কৌতুকের।
আয়নার ভেতরে দেখা যাচ্ছে বাঁধনের হা দৃষ্টি।
প্রেমা দেখলো। জামিল কে লুকিয়ে সে চোখ টিপে মৃদুহাসি দিল নিঃশব্দে। তার সারামুখে অনেকক্ষণ ধরে লেগে রইলো এক রহস্যময় কমলা রঙের হাসি।
তাতেই বাঁধন ভিতরে অর্ধেক মার্ডার।

বৈশাখের এক ফাংশনে উভয়ের সরাসরি পরিচয় হয়ে গেল ।
প্রেমার পূর্ব পরিচিত পিয়াস। সেই পরিচয় ঘটাতে মুখ্য ভূমিকা নিল। প্রেমা এসেছে অনুষ্ঠানে গান গাইতে। তার স্বল্প সময়। অল্প কথার মধ্যে ছেলের জন্মদিনের কার্ড দিয়ে গেল।
ফাংশনে প্রেমা পরেছিল হলদে রঙ লাল পাড়ের শাড়ি আর লাল ব্লাউজ। চোখে টেনেছিল কাজল, কপালে পরেছিল লাল টিপ। গাঢ় লাল লিপস্টিক রাঙানো ঠোঁট। গলায়, হাতে, কানে এবং খোঁপায় কাঁঠালচাঁপা ফুলের মালা দিয়ে সেজেছিল খুব। যেন ফুলের রানী।
দারুণ পছন্দ হয়েছে বাঁধনের। প্রেমার দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে অন্যমনস্ক বাঁধন সম্পূর্ণ মার্ডার হয়ে গেল।
পরেরদিনই প্রেমার ছেলের জন্মদিন উপলক্ষে দুই বন্ধু মিলে গেল প্রেমার বাসায়। কিছু ছেলে আছে যারা মেয়েদের সাথে ভাব মেশা দূরে থাক কথাটা সহজে বলতে পারেনা। বাঁধন সেই প্রকৃতির।প্রেমা এবং পিয়াসের আলাপ আলোচনায় সে খুব অবাক হচ্ছিল।
পরিচয়ের ধাক্কা কাটেনি। তার মধ্যে প্রেমা বেশ সাবলীল। স্বাচ্ছন্দ্যে জমিয়ে ফেলল আসর।

বাঁধন আর প্রেমা দুই মেরুতে অবস্থান। কিন্তু সেইদিনের পর থেকে অনুভবে দু’জন দু’ জনের মধ্যে অভিন্নতা ও হৃদয়ের টান অনুভব করতে লাগল। ওরা দেখেছে মনের অস্তিত্বে তারা এক। চিন্তা, চেতনা, অনুভূতি আর কল্পনার সূক্ষ্ম জগতে ওদের মধ্যে কোনো ভিন্নতা নেই। হবে হয়তো সে কারণেই পরিচয়ের পরে ওদের ঘনিষ্ঠ হতে বেশি সময় লাগেনি ।

এরপর প্রেমা প্রায়ই জুতো ক্রয়ের অছিলায় হুটহাট চলে আসে দোকানে। কথা অনুযায়ী নিয়মিত দেখা করতে লাগল শহরের চাইনিজ রেস্তরাঁ অথবা নিরিবিলি কোনো পার্কে। ক্রমান্বয়ে অন্তরঙ্গ হয়ে উঠল ওরা। প্রেমাকে না দেখলে বাঁধনের খারাপ লাগে। একইভাবে বাঁধন কে না দেখলে প্রেমা কাহিল। একেবারেই মুষঢ়ে পড়ে। দুইজনের খুবই ভাব। এই আন্তরিকতার পিছনে অবশ্য প্রেমার ভূমিকা ছিল বেশিরকম।
যাইহোক, সবাই দূর থেকে ওদের নিয়ে নানান গাল গপ্পো করে বটে কিন্তু সামনা সামনি কেউ ঘাটায় না। শহরে প্রেমার অনেক বন্ধু বান্ধবী। চলাফেরা কথাবার্তার অনেক সাহসী। সে কাউকে তোয়াক্কা করে না। একটি মেয়ে সমাজের সমস্ত নিয়ম ভেঙে মাথা তুলে ঘুরে বেড়াচ্ছে, অনেকে অভ্যস্ত প্রেমার স্বভাব চরিত্র সম্পর্কে। সেখানে বাঁধনের একটাই সুবিধা হয়েছে, বয়সের ব্যবধানের দরুন কোনো রহস্য লোকজন কেউ বোধ করেনি। প্রথমে খারাপ চোখে দেখত না । ওদের মেলামেশাটাও ছিল স্বাভাবিক শালীনতার মধ্যে।
প্রেমার গানের জন্য শুধু নয় তাকে ভালোলাগার অন্য একটি কারণ ছিল বাঁধনের। প্রেমাকে দেখে তার মনে হয়েছিল, কী এক অসামন্জস্যের পীড়ায় পীড়িত প্রেমার জীবন খন্ড বিখন্ড। ঘোর অমানিশার তিমিরে পড়েছে। জীবনের অটুট ভার বইবার ক্ষমতা ওর নেই। অখন্ডতার আনন্দ থেকে বঞ্চিতা মেয়েটি ভগ্ন বিপর্যস্ত। পরিত্রাণের জন্য সদাই আকুল। ও বড্ড অসহায়া এবং অসুখী। ওকে উদ্ধার করে বাঁচাতে হবে।
বাঁধন অত্যন্ত সুন্দর, কান্তিমান যুবা। যে কোন তরুণী প্রথম দর্শনে মুগ্ধ হয়ে যায়।
যৌবনের আবেগ আর কল্পনা বেশি। ধরাবাঁধা থাকতে চায় না। বাঁধনের দিকে প্রেমা চুম্বকের ন্যায় আকর্ষিত হয়ে পড়েছে। সে বাঁধনের প্রণয়াকাঙ্খী। অজান্তেই ভালোবেসে ফেললো।

এদিকে প্রেমার ক্ষণেক সঙ্গ পাওয়ার লোভে উতলা গানে মুগ্ধ ভক্তরা। তাকে সর্বদাই ঘিরে থাকে সঙ্গলোভী ভক্তের কলহ গুঞ্জন। প্রেমা সবাইকে একপাশে ঠেলে রেখে বাঁধন কে নিয়ে মাতামাতি করে। বাঁধন ওর ধ্যান, জ্ঞান, প্রেমাস্পদ। ওর চিরায়ত স্বপ্ন আকাঙ্ক্ষার পূর্ণ পুরুষ। বাঁধনকে কল্পনা করে তার দিন রাত্রি কাটে। বাঁধনের পেলব ভরাট বলিষ্ঠ শরীরের উষ্ণ রৌদ্রে পুড়ে তাকে আশ্রয় করে ভবিষ্যতের আশ্বাস পেতে চায়। আগ বাড়িয়ে বাঁধন নিজের থেকে ওকে বলুক, বিশ্বাস করতে শেখাক, পৃথিবী অনেক সুন্দর। এর সিংহভাগ পুরুষ এক নয়। বাঁধনের জন্য সে এখন বাঁচতে চায়।
বাঁধনের সামনে চেষ্টা করেও প্রেমা কথা বলতে পারেনা। মনের কথাটা প্রকাশ না করতে পেরে প্রেমা ছটফট করত। একসময় বাসনাটা প্রায় জেদে পৌঁছে গেল।
কতদিন বাঁধনের সামনে বলে ফেলত প্রেমা, “খোদার কী বিচিত্র লীলা। তিনি এমন বাঁধার সৃষ্টি কেন করলেন আমার জন্য।”
বাঁধন ক্ষণেক অপ্রস্তুত। প্রেমার দূর্বোধ্য কথা। তার লেখার একাগ্রতা নষ্ট হয়েছে ।সে ঔৎসুক হয়ে বলল, “সব পাল্টে যাবে।”
—, “কী?”
—, “এই যে তুমি যা বললে। একদিন হবেই।” আনমনে বলে বাঁধন।
সঙ্গে সঙ্গে প্রেমার কালো মুখ লাল। সে সলাজ হাসল।
—. “এখনই কেন হয়না?”
—, “কী?” বাঁধন কিন্তু অতশত বোঝেনি। তাঁর বিশ্বস্ত আদর্শ ছিল। ভালবাসার মতো তার কোনো প্রতিক্রিয়া হয়নি। প্রেমা কে একজন ভালো বন্ধু বলেই মনে করে।
—, “না গো তেমন কিছু না। মেয়েদের মনের সব বুঝতে ঢের বাকি তোমার।”
—, “আচ্ছা, তবে থাক। বলে কাজ নেই।”
এই পর্যন্ত ছিল ওদের স্বাভাবিক প্রেমাবেগ প্রকাশের সম্পর্ক। জটিল না। আবার খুউব যে একটা ঘনিষ্ঠতা তাও না। মাঝে মাঝে নিরালায় একত্রিত হওয়া, কিছু কথাবার্তা, আলোচনা, গান শোনা, কবিতা পাঠ কিংবা তারাভরা রাতে দুজনে মিলে বারান্দায় বসে চাঁদ দেখা ইত্যাদি।অন্তরের নিভৃতে নিজেদেরকে একান্ত আপন ভেবে অবলম্বন করে দুজনায়। দুজনের দুই মন মিলে মাধবীলতার ন্যায় সাঁই সাঁই বেড়ে ওঠে। মনে কত কী যে ভাবে। অপ্রাপ্তবয়স্ক বালক বালিকার মতো অপেক্ষা করত দুজনে। প্রেম সাগরে ডুবে হাবুডুবু খায় কিন্তু ভুলেও কেউ কখনো স্বীকার করে না ।

সময় গড়ায়। অবস্থা পাল্টে যায়।
সমাজের দৃষ্টিতে ওদের অবাধ মেলামেশাটা নিঃসন্দেহে দৃষ্টিকটু ছিল।
পূর্বেই বলেছি, প্রেমা বিবাহিতা। দুই সন্তানের যুবতী জননী, স্বামী বর্তমান । বাঁধন প্রাপ্তবয়স্ক, অবিবাহিত সুদর্শন যুবক পুরুষ।
পাড়ায় মুখরোচক কাহিনী ছড়াবার লোকের অভাব নেই। ওদের ক্ষেত্রে হয়েছিল তাই। ঘটনার চেয়ে রটনা বেশি হয়ে গেল। এতে করে ওদের সম্পর্কের ভিত্তি আপনা আপনি হয়ে যায় আন্তরিক মজবুত এবং বেপরোয়া।সমস্ত নিয়ম ভেঙে মাথা মাথা তুলে দাঁড়ালো ওদের সম্পর্ক।
প্রেমা গান গাইত,”জড়িয়ে গেল সুর দুই প্রান্তের তারে,
জীবনবীণা আর বাজেনা ঠিক তালে।।।।
বাঁধন গানের ছন্দে ছন্দে অমনি লিখত কবিতা,” সমাজের রুঢ় শাসন মুছে দিতে, ভাঙতে হয় পায়েলের সেই সোনা শেকল। ”
এভাবে হয়তো আবেগ উন্মাদনার নতুন সৃষ্টিতে সৌন্দর্য আর আনন্দের আবেদন পরিবেশন করে ওদের জীবন চলতে পারত। কিংবা হতে পারত আরও একটু অন্যরকম সামাজিক। কিন্তু তা হয়নি। জীবন সংসার বড়ো বিচিত্র। দুজনের মধ্যকার বিভেদের যে অনিবার্য দেয়াল মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। প্রকৃতির সেই অলংঘনীয় অনিশ্চিত জীবনের ঝুঁকি নিতে পারার মতো দুঃসাহস ওদের কারোরই ছিল না।
চলবে……..

এ জাতীয় আরো সংবাদ