1. successrony@gmail.com : Mehedi Hasan Rony :
  2. rj.nazmul2500@gmail.com : Nazmul Hossain : Nazmul Hossain
শনিবার, ২৮ মার্চ ২০২০, ১২:১৭ অপরাহ্ন

কুবলয়- ৬ষ্ঠ পর্ব

সিফাত হালিম, ভিয়েনা, অস্ট্রিয়া।
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২৯ ফেব্রুয়ারী, ২০২০
  • ৩৫ বার

এমনিতেই আইজউদ্দীন কিন্তু খুবই স্বভাব কৃপণ লোক। পিঁপড়ের পেট টিপে টিপে কৃপণ যেমন মধু বের করে নেয় তারও তেমন ঝোঁক অর্থ কামানো । আরেকদিকে হাত দিয়ে তার সহজে একটি আধলাও গলেনা। এই কৃপণতার জন্য সে কখনও উচ্ছৃংখল হতে পারলো না। দামী বেশভূষা, জামা জুতো পারেনা। বিলাস সামগ্রী ক্রয় করে না। রিকশা কিংবা ট্যাক্সিতে চড়ে চলে না। অথচ তার বড় দুই পুত্রের চরিত্র পিতার সম্পূর্ণ বিপরীত। নোংরামি, উচ্ছৃংখলতায় অতি গূণধর। ব্যতিক্রম দুষ্টু সুপুত্রই বলা চলে। চারিত্রিক দোষ ছাড়াও তারা যৌক্তিক নিষ্কর্মার ধাড়ি। আইজউদ্দীনের রক্ত পানি করা পরিশ্রমের টাকার তাল্লুকিতে ভেরেন্ডা ভেজে বেড়ায়। গায়ে হাওয়া লাগিয়ে খায়। বিভিন্ন অজুহাতে বাড়ির বাজার সদাইটা পর্যন্ত করে দেয় না। সাপ্তাহিক ছুটি ব্যতীত বাকি দিনগুলো আইজউদ্দীন লম্বা সময়ের জন্য গৃহে অনুপস্থিত থাকে। দুই পুত্রের তখন পোয়াবারো। আইজউদ্দীনের সামনে তারা ঠিকই চুপচাপ থাকে। আর সে বাড়ি থেকে বেরুলেই তারা নিজ নিজ মূর্তি ধারণ করে ।

আইজউদ্দীনের ধর্মে বিশ্বাস আছে, খুব একটা ভক্তি নেই। রোযা রাখে, ঈদের উৎসব পালন করে। কিন্তু মসজিদে যাতায়াত করতে তাকে খুব কমই দেখা যায়।
তাকে জীবনে বহুরকম পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে । সে বুঝেছে, যথাসময়ে যথারীতি কৌশল প্রয়োগ করেই জীবনে উঠতে হয়। যার পুরস্কার থাকে , সে সমাজের তুঙ্গে ওঠে। যার থাকেনা তারা সারাজীবন মসজিদে গিয়ে কপাল ঠুকলেও উপরে উঠতে পারবে না।

আইজউদ্দীনের প্রাতঃকালে ওঠা অভ্যাস। এই অভ্যেস তার বারো মাস। বেশ কয়েক বছর ধরেই সে পৃথক ঘরে একলা ঘুমায়। ঘুম ভাঙ্গা মাত্র নিম ডালের দাঁতন করতে করতে ঘাঢ়ে গামছা ঝুলিয়ে দোতলা থেকে নেমে আসে।
এক তলায় ঠিক সিঁড়ির মুখে পরপর দুটি ঘরে পর্যায়ক্রমে তার স্ত্রী জামিলা বেগম ও বড় ভাই এর বিধবা স্ত্রী থাকে।
দাসী ভৃত্যের খিদমতগারী পছন্দ করে না আইজউদ্দীন। তার মর্জি মাফিক বড় ভাবী এর মধ্যে সরিষার তৈলের শিশি ও একটা কাঁসার বদনা বারান্দায় সাজিয়ে রাখে।আইজউদ্দীনের হাতে এক খাবলা সরিষার তেল ঢেলে দিয়ে সে যাবে হেঁশেলে রান্নার তদারকিতে। বলা আবশ্যক, এই বিধবা বড় ভাবীর উপরেই আইজউদ্দীনের সংসারে যাবতীয় কর্তৃত্ব ন্যস্ত।
তারপর আইজউদ্দীন হাতের সরিষার তৈল মাথায় ঘষতে ঘষতে আর কাঁসার বদনা হাতে নিয়ে পূষ্করিণীর দিকে রওয়ানা হয়। ডুবিয়ে গোসল না করলে নাকি তার ভালো ঘুম হয় না।

এই বাড়িটা দুই ভাগে ভাগ করা। পিছনের দিকে ঢেঁকি ঘর, গোলা ঘর হাঁস মুরগি ও পাখির ঘর এবং পাকা ইঁদারা। কিছু ফলমূলের গাছের মধ্যে হাঁটা পথের পাশে উঁচুতে তাদের ইটের ঘেরা চাঁড়ি বসানো মল ত্যাগের ঘর। ইটের সিঁড়ি বেয়ে উঠতে হয়। ইতোমধ্যে আইজউদ্দীনের গলার আওয়াজ পেয়ে, ভৃত্য বালতি ভরে কুয়োর জল তুলে তার জন্য সেখানে প্রস্তুত থাকে। আইজউদ্দীনকে দেখামাত্র হাত থেকে বদনা নিয়ে জল ভরে দেয়।
আইজউদ্দীন সেখানে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁতন ঘষে বালতির জলে মুখ পক্ষালন করে ভরা বদনা নিয়ে প্রাতঃকৃত সারতে যায় । তারপর গোসল। এবং গোসল সেরে ভেজা বস্ত্রে ওপরে উঠে এসে নিজের কক্ষে একবারই কাপড় পাল্টে বাইরের বস্ত্র পরে তৈরী হয়ে নেয়।
ইতোমধ্যে রান্না হয়ে যায়। ভাত তরকারি বেড়ে এনে গুছিয়ে সেঘরে প্রস্তুত থাকে বড় ভাবী।

অতিশয় ব্যস্ত মানুষ আইজউদ্দীন । সকালে নাকে মুখে কিছু অন্ন গলাধকরণ করে কোর্টের কাগজ পত্র আর বাজারের থলি নিয়ে সাইকেলে চেপে বেরোয়। কোর্ট শেষে বাজার থেকে ফিরতে ফিরতে কোনদিন রাত্র আটটা ন’টা বেজে যায়। তারমধ্যে নিজের সম্পত্তির আয় উপার্জন, দলিল দস্তাবেজ দেখতে গিয়ে প্রায় সময়টা কেটে যাবে । মূলত তার বাড়িতে থাকার অবকাশ কম।
আইজউদ্দীনের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে বসে ভালোমন্দ বাক্যালাপ, পড়াশোনার খোঁজ করা দূরে থাক তাদের ঠিকমত মুখ দর্শন পর্যন্ত হয় না । জামিলা বেগমের নিকট থেকেই সন্তানদের সব বিষয়ে অবগত হয়। জামিলা বেগমের মাধ্যমেই তাদের যাবতীয় দাবী-দাওয়া মেটায়।
আইজউদ্দীনের গৃহে অতুল বৈভব। এক পুরুষে উপার্জন করা এতো সহায় সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণ করতে গেলে সংসার বিষয়ের একটু আধটু এদিক ওদিক হতেই পারে। সন্তানের স্নেহ মায়ার ব্যাপারটাকে সে মনে কোনো স্হান দেয় না। তাই নিয়েই তার এতখানি জীবন কাটলো।
আইজউদ্দীনের প্রথম ও দ্বিতীয় পুত্রের ডাকনাম যথাক্রমে মদন ও জগন। আসল বা প্রকৃত নাম অবশ্যই আছে। মোহাম্মদ দিয়ে শুরু।

যাইহোক, আইজউদ্দীনের জ্যেষ্ঠ পুত্রের নাম মদন রাখার কাহিনীটা খুবই চমকপ্রদ।
ভাঙাড়ি কিনতে কাঁধে ঝাঁকা ঝুলিয়ে বাড়ি বাড়ি ঘোরে ফেরিওয়ালারা। পাড়ার বৌ-ঝি, বাচ্চারা ঘরের পুরনো লোহা-লক্কড়, ভাঙা টিন, কাঁচের শিশি বোতল, ছেঁড়া কাটা জুতো স্যান্ডেলের বিনিময়ে ফেরিওয়ালার কাছ থেকে গুড় ময়দার তৈরী রসালো মদন কটকটি, তিলের খাঁজা নেয়।
একবার এক ফেরিওয়ালা, “নেবেগো মদন কটকটি, মদন কটকটি” বলে আইজউদ্দীনের সদর দরজায় ঝাঁকা নামিয়ে গলা বাড়িয়ে হাঁকাহাঁকি করছিল।
দরজার দুইপাট রয়েছে হাট করে খোলা। মদনের বয়স মাত্র সাত মাস।সবেমাত্র হাঁমাগুড়ি দিতে শিখেছে। বেশ হৃষ্টপুষ্ট। ভালোই দেখা যায়। তেল কাজল মাখিয়ে বারান্দায় সূর্য্যের রৌদ্র ও কাঁথার গরমে শোয়া মদনকে রেখে জামিলা বেগম গেছে কাছাকাছি হেঁশেল ঘরে, তরকারি নাড়া দিতে। কীভাবে যেন সেই শিশু বারান্দা থেকে নেমে হাঁমাগুড়ি দিয়ে ফেরিওয়ালার ঝাঁকায় উঠে বসেছিল।
ফেরিওয়ালা মাত্র ঝাঁকা মাটিতে রেখে গেট ছেড়ে গিয়েছে ঐপাশে। তারই মধ্যে এই কান্ড।
ঝাঁকায় উঠে বসে মদন হাতের মুঠিতে থাবা দিয়ে দিয়ে কটকটি মুখে পুরে রসআস্বাদন করতে শুরু করেছে যেন। সেইসঙ্গে খলখল হাসি। চারিদিকে জনশূণ্য। ঝাঁকায় জলজ্যান্তো শিশু।
ফেরিওয়ালা ভয় পাবেনা তো কী? তার ভয়ার্ত চীৎকার আর দাপাদাপি।
মদনের মা বড়চাচী সহ বাড়িশুদ্ধ লোক সেখানে দৌড়ে উপস্থিত হলো। মদনের কান্ড দেখে কপালে উঠেছে সবার চোখ।

স্ত্রীর মুখ থেকে এই রোমাঞ্চকর হাসির খবরটি অবগত হয়ে অন্তরে যারপর নাই পুলকিত বোধ করলো আইজউদ্দীন। সে পরম পরিতৃপ্তি পেয়েছিল। বাপকা বেটা। পুত্রের গৌরবে গৌরবান্বিত তার ধারণা হলো, অন্যেরটার উপর যখন এই বয়সে হামলা করা শিখেছে । আরও দিন সামনে আছে। ভবিষ্যতে তার নাম রাখতে পারবে। এই পুত্রই হবে তার সম্পত্তির রক্ষাকবচ।

হিন্দুদের এলাকায় হিন্দুদের বাড়ি ক্রয় করে সে বসবাস করে । এলাকার অধিকাংশ লোকই হিন্দু ধর্মের। আইজউদ্দীনের আচার বিচারেও অনেকখানি হিন্দুয়ানা প্রভাব ফেলেছে । তার স্ত্রী জামিলা বেগম ভারতীয় মুসলমান। জামিলা বেগমের কথাবার্তা, চালচলন ঐদেশের মতো। পুত্রের নাম মদন রাখতে দোষ কোথায়? বিশেষত সবাই যখন বাঙালি। প্রত্যক্ষদৃষ্টে, মদন হিন্দুদের নাম বলে মনেহয়। আসলে মদনের সঠিক বাংলা অর্থ হচ্ছে, “প্রেমের দেবতা” কিংবা “বসন্তকাল”। তার পুত্রেরও রয়েছে মদন কটকটি প্রীতি। সাত মাস অতিক্রান্ত। পছন্দসই নামের অভাবে এখনও পুত্রের নামকরণ হয়নি। যেইভাবা সেইকাজ। তারপর আইজউদ্দীন ঘটা করে পুত্রের মুখে ভাত অনুষ্ঠান করে নাম রাখলো মদন।
দ্বিতীয় পুত্রের নাম রাখা নিয়ে তাদের বিড়ম্বনা হলো না । জামিলা বেগম নিজের নামের আদ্যক্ষর নিয়ে মদনের সঙ্গে মিলিয়ে রেখে ফেললো, জগন। এবং পরবর্তীতে ছোট পুত্রের নাম রাখা হয়েছিল, বাবন।
চলবে………

এ জাতীয় আরো সংবাদ