1. successrony@gmail.com : Mehedi Hasan Rony :
  2. rj.nazmul2500@gmail.com : Nazmul Hossain : Nazmul Hossain
বুধবার, ২০ জানুয়ারী ২০২১, ০৩:২৭ পূর্বাহ্ন

চব্বিশ ঘণ্টা- খন্ড কাব্য

সিফাত হালিম, ভিয়েনা।
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১২ ডিসেম্বর, ২০২০
  • ২৯৯ বার

সে একা বহুক্ষণ ধরে ট্রেনের একটা কামরায়। গাড়িতে বসে বসেই ঘুমাচ্ছিল। ভাবছিল, জুড়ছিল, ভাঙ্গছিল, চোখ মেলছিল আবার বুজে আসছিল আপনিই।তার বুকে মাথায় অহরহ যন্ত্রণা, চোখে জ্বালা, মন অস্হির।কাশিটা বেড়েছে। চোখ বুজে রেখেও সে ঘুমাতে পারে না।

এইমাত্র আরেকজন এসে বসে মুখোমুখি আসনে। একেবারে পরিচিত গায়ের গন্ধ অকস্মাৎ । স্নায়ুর মধ্যে বিস্ফোরণ । অনেক সময় আশ্চর্য রকমের অস্বাভাবিক ব্যাপারগুলো স্বাভাবিক হয় দাঁড়ায়। যেভাবে সক্কলে চলন্ত গাড়িতে অপরিচিত সহযাত্রী একজন আরেকজনকে দেখে, তাকায়। সেইভাবে শান্ত চোখে সে দেখে। অল্প আলোর নীচে টকটকা গোলাপী ফর্সা সুন্দর মুখখানিতে কিছু বয়সের আঁচড়। ভারী মিষ্টি দেখতে আজও। ঝটকা লেগে সে নড়েচড়ে উঠলো।

দ্বিতীয় শ্রেণীর কুপে। নামে দ্বিতীয় শ্রেণী। কিন্তু অধিকাংশ বগির কাঠের সীট আছে উপরের গদি নেই। মাথার উপরকার পাখা ঘুরেনা। এখানে যা ঢিমে আলো। পাশের বগিতে বুঝি আলো নেই, অন্ধকার ।দু’বগির একটাই বাথরুম। অপরিস্কার নোংরা, কখনও পরিমাণ মতো জল আসেনা।

বসতে না বসতেই নবাগতা কথা শুরু করে,

আজ গাড়ির গতি বড় দ্রুত। একটু হলেই ফেল মেরেছিলাম আর কী?

দূর পাল্লার গাড়ির গতি ঠিক আছে। আমাদের সময়টা এখন এমনই দ্রুত গতির। অনভ্যাস বশত: ঘড়ির কাঁটা সঠিক দেখতে ভুল করার।

হু, তা হতে পারে। বয়স একেবারে ফেলনা না।

উত্তর এলো অস্ফুট।

তা হতে পারে নয়, তাই হয়েছে। বয়স লোকের শত্রু। লেন্সটা পাল্টানো দরকার।

অনেক দিনের সখ্যতা যেন এরকম একসাথে হেসে উঠে দুজনে।

মুখ দুটো পরিস্কার দেখায় না। দুই বুড়ো বুড়ি। দুজনেরি বয়স ভারির দিকে।চোখে পুরু লেন্সের চশমা। দূরের পথ যাত্রায় সহযাত্রীর সাথে ভাব জমিয়ে পূর্ব পরিচিত ঢঙে কথা শুরু করে।

এই লাইনে এতো ভিড়ভাট্টা থাকে। গ্যেটে বাত, কোমর, হাঁটু পিঠের ব্যথা নিয়ে প্রায়ই প্যাসেঞ্জারি করি। অধিকাংশ সময় বসার জায়গা পাইনা। বয়স্কা আর মহিলা বলে লোক সমীহ করে সীট ছেড়ে দেয়। কিন্তু আজকের মতো এতো ফাঁকা ভাবা যাবেনা।

—–হ্যাঁ । তার উপরে সুন্দরী হলে তো কথাই নেই। তুমি এই বয়সেও তেমন আছো। আকস্মিক তোমায় দেখে খুব ভালো লাগলো। কেমন আছো?

এতোবড় ট্রেন। গোটা পঞ্চাশেক লোক মনে হলো।  কিংবা তারো কম। ঐদিকে বোধহয় কোনো গন্ডগোল,,,,,, শুনলেন কিছু???

কারখানার লকআউট, ধর্মঘট প্রাত্যহিক রুটিন।বন্ধ ঘোষণা দেশের নিত্য ঘটনা হয়ে উঠেছে । পিকেটিং, ধরপাকড় জোর হচ্ছে পিছনে ।

তাই ভাবলাম। যাত্রীর আকাল কেন? পেট পুরে হাজার যাত্রী নিয়ে চলে। হঠাৎ এমন পেটখালি গাড়ির ?

এই নিয়ে দুইবার। তুমি আছো কেমন, ভালো আছো?

আর থাকা। না থাকার চাইতে অনেক বেশী টিকে যাচ্ছি। ও মশাই হঠাৎ এইসব কথা জিজ্ঞেস করছেন, আপনিই বা কে?

হাতে সময় আছে, দীর্ঘ অবসর। তুমি সর্বাঙ্গে সুন্দরী সহযাত্রী। সমস্ত মানুষ থেকে আলাদা। শীতের মধ্যেও মন বেপরোয়া রোমাঞ্চ হয়ে যায়।

ট্রেনে অনেকক্ষণ? আর কিছুক্ষণ আছেন নিশ্চয়ই?  অনেক দূরের পথে যাবো , তা ধরেন ঠিক ঠিক চব্বিশ ঘণ্টার পথ। গন্তব্য শেষ স্টেশন। আপনার ?

আমিও তোমার পথের পথিক ছিলাম । একজনকে দেখতে মিনিট ত্রিশ ধরে চলছি। যাত্রা বিরতি শেষের স্টেশন।

একা একা লম্বা ভ্রমণ, পাক্কা চব্বিশ ঘণ্টা। কতক্ষণ মুখ বুজে থাকি ? কি করা যায় বলুন তো?

একা ভ্রমণের মধ্যে আনন্দ লুকানো আছে। একটুক্ষণ একাই যারা চলেছেন তারাই বলবেন কথাটা।

উহূহূ মোটেও তা না। আমি বাপু বিপরীত। কথা না বলে থাকতে পারিনে।

সে তুমি বরাবরই। আমার কথা শুনতে আপত্তি নেই বরং ভালোই লাগছে। বুকের মধ্যে মৃত্যু। একেক দিন একেক রকম সাধ হয় । অনেক কাল মুক্ত খোলাতে বসে গল্প করা হয়না ।

যাক বাঁচালেন। আপনি তবে রাগী কিংবা রাশভারি নন? আশাকরি আমাদের সময় ভালোই কাটবে ।

তবে তুমি,,,,,তুমি,,,এবং তুমি। আমার নাম,,,,,,,

না বাবা না। আমি ফট করে অল্প পরিচিত কাউকে তুমি বা নাম ধরে বলতে পারি না। আমরা একই পথে যাচ্ছি, নামবো। পার্থক্য আপনি কয়েক স্টেশন আগে উঠেছেন আমি পরে এইযা। আপাততঃ  নাম জেনে কথা খরচার দরকার নেই।

বুড়োটা মনেমনে ভাবে, তুমি আজও আমায় নাম ধরে ডাকতে পারলে না।

কিন্তু আমি যে বলছি ?

সেটা আপনার বুঝ, দয়া কৃপা, এইসব। তাছাড়া অনুমান, আমার বয়স কিছু কমই হবে।

দয়া কৃপা এসব ছাড়াও কথা বলা যায় শ্রুতি ।

আপনি দেখি আমার নাম জানেন। ম্যাজিক না কী?

তোমার স্যুটকেসের গায়ে পরিষ্কার হাতে নামটা লেখা রয়েছে। অমনি মনে হলো,নাম শ্রুতি হবে । আন্দাজে ঢিল ছোড়া। আজকে আমার দিন ভালো ।

আপনার শরীর খারাপ। লক্ষ্য করছি খুব কাঁশছেন? এভাবের শরীর নিয়ে এতো দূরের পথে ভ্রমণ,,,, । একলা বেরুলেন যে, একেবারেই অনুচিত ঠিক হয় নাই।

কী করবো? যতক্ষণ শ্বাস ততক্ষণ আশ। ভ্রমণ স্বল্প সময়ের ব্যক্তিগত। বুকটাতে ব্যাথা অনেক দিনের ।

ডাক্তার করান না কেন?

এ ব্যথা উপশম করা কোনো ডাক্তারের কর্ম না।

বিয়ে করেননি?

প্রথম ভালোবাসা ভোরের ফোটা প্রথম ফুলের মতো। রৌদ্র ওঠার আগেই ঝরে পড়ে। একজনকে মনে ধরেছিল, ভালোবেসে ছিলাম। তারপরে আর সময় পাইনি।

গ্রেট। গল্পের প্লট খুঁজে পাওয়া গেল। জীবন একটা নদী। প্রেম নদীর নৌকা। আর জোয়ার যৌবন। যৌবনে জীবন নদীতে নৌকা বাইনি এমন লোক কম আছে। আসুন যেতে যেতে গল্পটা করা যাক। সময়টা ভালো কাটলো।

সঠিক সময়ে সঠিক জায়গায় এসে পড়েছ তুমি । কী বিষয়?

আপনার অতীত। আমাদের প্রত্যেকের নেপথ্যে একটা অতীত থাকে। একদিন যখন বয়স কম ছিল। আপনার সেইসব শ্রেষ্ঠ দিন, যুবক জীবনের ভালোবাসার গল্প ?

কথাটা সত্যি সেইদিন নয়, আজকে আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ দিন । কে প্রথম তুমি ?

আমার সেইসব দিনের কথা এখন আর মনে করিনা। বোকা গবেটরা প্রেমে পড়ে। আমাদের যুগে ঐসব ভাবাই যায় না। মনেমনে হয়ে থাকলে হয়তো হয়েছে কিছু। আর মেয়েদের মুখে প্রকাশ,,,, ক্ষমা করবেন। বিরাট অপারগতা । তার ‘চে আপনার কথা শোনান।

অন্ধকার রাত কেউ কাছে রাখতে চায় না। ঠেলে দেয়। তোমার দুহাত ভর্তি অঢেল দয়া ।

ওকে বিয়ে করলেন না? ওকি আপনাকে ভালোবাসতো না?

ও ভালো বাসতো কিনা জানি না। তবে আমি ভালোবাসি। প্রত্যাখ্যাত হবার ভয় ছিল।

ওহো এক তরফা।

দু’ তরফার সুযোগ কোথায়? ও আমার ভালোবাসা জানলোই না।

অবিশ্বাস্য। এরকম ভালোবাসা হয়?

হয়তো । আর আমার সেটাই হয়েছে। তোমাকে বলা হয়নি, আমি ওর কাছেই যাচ্ছিলাম। কতকাল ওকে দেখিনা। ভালোবাসি কথাটা এবারে বলবো।

সেকী। আপনি অনেক মজার লোক। এতো বছর পরে, এই বয়সেও,,,,,,মজা করে কথা বলতে পারেন।

এখন বছর ত্রিশ পূর্বের বিবাহিতা, স্বামী বর্তমান,অবস্থাপন্ন ঘর , ছেলেপুলে ভরা সংসার ওর।

ঠিক বুঝলাম না, জটিল। ও শুনবে?

শুনবে শুনবে। শুনছে তো,,,,,, যখন শুরু করলাম,,,,,,,,,

পাগল আর কাকে বলে। এমন অদ্ভুত কথা জীবনে শুনিনি।

এর জন্যই বলা হয়না। আমি তাহলে ওই দিকের বগিতে গিয়ে বসি।

না, না আপনি বলেন আমি শুনবো। যেদিন ও এই ব্যাপারটা জানবে সেদিন আপনাকে পাগল আখ্যা দিতে পারে ।

দিলে দেবে। সেটা ওর ব্যাপার। আমি তো পাগলই ওর জন্য।

এইসময় ও আপনাকে ঘৃণা করতে পারে?

সেটা পারবে না। সেটা পারবার উপায় নেই।

কেন?

ঘৃণা করবার মতো কোনো কাজ করেছি এই পর্যন্ত? অন্ধকার কুপেতে বসে থাকা একটা সুন্দরী রমনী আর মাঝ বয়সী  অবিবাহিত একটা পুরুষ।  একা একা একান্ত দুজন। তার উপর একলা কাছে পেয়ে কোনরকম বাজে প্রস্তাব,,,,, কাজ,,,,,, জোর করে অসভ্যতা??? চিৎকার করে ডাকলেও কেউই এখানে আসবে না যখন।

না তা করেননি। তবে আমি আর ও কি এক হলো?

সেই একই কথা। শরীর জন্মায় প্রেম নিয়ে। বয়স দেখেনা। সেও তোমার বয়সের সুন্দরী রমনী। তোমার মতই কপালে লাল টিপ পরে। লাল টিপে ওকে অসাধারণ দেখায়। ধরো কোনপ্রকারে অঘটন একটা যদি ঘটিয়ে দেই।

যদি’র কথা নদীতে । এসব কি বলেন ছিঃ?

ছিঃ বলো, বলো । উত্তেজনা আর অভিমান অভিব্যক্তি তোমার পাতলা ঠোঁটে ভালো ফোটে। বাতাসের দোলায় সুন্দর দুলে উঠলো ।

আপনি অনেকখানি অসুস্থ অস্বাভাবিক লোক।

আমি কি তোমাকে আঘাত করলাম?

না। তবে শঙ্কা ছিল।

আমি খুবই নীরিহ পরিচ্ছন্ন ভদ্রলোক। আমার কোথাও কুটো ময়লা নেই। অন্তত পরিচিতরা তাই জানেন । আমি স্বাভাবিক কথা বলছি আর তুমি অস্বাভাবিক খোঁজো।

আবোল তাবোল বকছেন। মনেহচ্ছে পাগলের প্রলাপ। আপনি কি কোনো পাগলা গারদ থেকে পালিয়ে এসছেন?

কথাটা সত্যি। আমি পাবনার পাগল , পালিয়ে এসেছি । একনাগাড়ে ত্রিশ বছর ধরে জেগে ছিলাম ।

ও মাগো, পাগল। তবে ভয়ানক লোক। এখন আমার আপনাকে ভয় লাগছে । আমি প্রথমে এমনটাই আশঙ্কা করেছি, উস্কোখুস্কো বড়ো চুল, চোখমুখ ঢাকা দাঁড়ি গোঁফ, কাঁধে চটের ঝোলা।

না না আমাকে সেরকম ভয় করবার কিচ্ছু নেই। আমাদের জায়গায় পৌঁছাতে মাত্র চব্বিশ ঘণ্টা সময় । তারপর তো দুজন দুদিকে। আমি তোমাকে আটকাবো না।  মানে আমরা যে যার পথে। তাছাড়া এই বগির সাথেই গার্ডের ঘর। পুলিশের লোকও আছে দুজন । আমি ইতোমধ্যেই দেখে নিয়েছি। পাগলামির কিছু দেখলে আর ইচ্ছা করলেই আমাকে ধরিয়ে দিতে পারো। সহজ সমাধান।আশ্বস্ত থাকো। ঘৃণা করবার মতো কি যেন বলেছিলে তখন,,,,, ?

আমি শিওর ও আপনাকে ঘৃণা করবে।

আমি পাগল?

ঘাট মানছি, মনের ভুল ।

তবে তুমি শিওর হলে ও আমায় ঘৃণা করবে?

আপনি বললেন ওর  ঘর আছে। মন ও দেহ ভাগাভাগির একটা মানুষ আছে। হয়তো সহায় সম্পত্তির মালিক। কোনদিকে অভাব বোধ নাই।

অতোশতো জানিনা। দেখে তাই মনে হলো । আমারো একখানা ঘর বাঁধতে সাধ হয়। টাকা পয়সা আছে। মনের মানুষ নেই। নিজের সব কিছুকে অংশী করবার একজন মানুষের প্রয়োজন।

সেটা ওর ঘর ভেঙে কেন?

কে বললে তোমায়, আমি ওর ঘর ভাঙছি ?

আপনার মতিভ্রম ঘটেছে। যা বলেন মাথা ঠান্ডা করে বলেন।

মাথা ঠান্ডা করতে চাচ্ছি, হচ্ছে না। এই মুহুর্তে এতো কাছে পেয়ে,,,আজ আমার এতো কাছে তুমি,,, সব অপ্রত্যাশিত,, অপ্রত্যাশিত ঘটনা,,,,,,,যেন,,,,,, এবারে সত্যিই পাগল হবো।

নেমে প্রথমেই ভালো করে তিব্বত কদুর তেল মাথায় ঘষে শীতল জলে নিজেকে চুবিয়ে নেবেন।

তুমি খুব মাস্টারনি মার্কা কথা শিখেছ?

সেদিনের কথা। কত তক্তা কেটে ছেটে, লোহা পিটিয়ে পিটিয়ে এই হাতে বাক্স করেছি।

তখন ভয় ছিল না ????

তুচ্ছ ব্যাপার। এখনও না।

কলেজের চাকরি  ,ভালোইতো। ছাড়লে কেন?

ধরাবাঁধা দশটা পাঁচটা সময়। মন বাঁধা থাকতে চাইনি।

তোমার লেখাযোখা, উপন্যাস কবিতা ভালো লিখতে। বাদ দিলে,,,,,,,

সংসার সামলাতে যা হিমশিম খাই । বিশেষ সংখ্যা গুলোয় যায়।

তারপর কিছুটা চুপচাপ দুজন।

হঠাৎ চুপ মারলে যে, কথা বলো।

এতক্ষণে অনেক কথা বলে ফেললাম। কী বলার?

আছে।

আপনাকে ভদ্র শিক্ষিত বলে মনে হয় । সমাজ কি বলবে?

সমাজ। সমাজ। সমাজ। এইই দ্যাখো কপালে একটা গভীর ক্ষত। তোমার সমাজের আদরের উপহার।আমি সমাজকে মানিনা। সমাজ কি বলবে এতো জানা কথা। সমাজের ভয়ে, অভিভাবকের চাপে ভয়ে কত জীবন অকালে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সমাজ খবর রাখে কোনো। তার জন্য যা সইতে হয়, আমি সইবো। তুমিও সহ্য করো।

এ্যা আমি সহ্য করবো মানে কি?

কথার কথা বললাম।

ওরকম কথার কথা বলবেন না । দেওয়ালের ও কান আছে। আমার নিজের কেউ শুনলে কলঙ্ক রটবে। ভেবে কথা বলেন। এমনভাবে বলছেন ভিতরে তিক্ততা গুলিয়ে উঠলো যেন।

তুমি আহুদা ভয় পাচ্ছো। আমার সময় নাই ভাবাভাবির। সময় অত্যন্ত কম। সত্যিই বলছি আমার মাথার দিব্যি, না থাক, তোমার মাথা ছুঁয়েই বলি আমার ভিতরে খুন চেপে থাকে সবসময় ,,,,,,,,,

এই না, না, না  আমাকে ছোঁবেন না বলছি। যেখানে বসে আছেন, দূরত্ব রেখে বসে থাকেন।

এইই বসলাম। তুমি সামান্যতেই চটে ওঠো। সেও অমনি ছিল ,,,,,

সেখানে কী করতে চাইছেন ?

কিচ্ছু নেব না। শুধু সামনে বসিয়ে দেখবো। মোটে চব্বিশ ঘন্টা। ওকে আটকে রেখে গান গেয়ে শুনাবো।

আশ্চর্য কথা । ভারী অদ্ভুত লাগলো । কিছু চাননা অথচ আটকে রাখবেন ? শুধুমাত্র গান শুনাতে?এও কীরকম যেন উদ্ভট ? কী গান শুনাবেন ???

শুরুর থেকেই গাইছি শুনতে পাওনা ? আমাদের কত গান,”আমি এতো যে তোমায় ভালোবেসেছি”

মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়,

তুমি খুব মেধাবী।অনেক গানের শিল্পীর নাম মুখস্থ রাখতে পারো ,,, আজও সেইরকম। তুমি আজ এতো কাছে, সোনার মেয়ে গো,

শুনলুম, গলা বেশ। যারা গান করে ভালো স্বভাবের ওরা। একজন পরস্ত্রী আটকে রেখে গান শুনাবেন, মন্দ লাগলো। সত্যিই আমার চিন্তা হচ্ছে। যে কোনো কারণে আপনার মাথা গরম। আপনি বুঝতে পারছেন না, সেখানে কেন যাচ্ছেন। এতো বড়ো কঠিন সিদ্ধান্ত। কেউ কারো জন্য নেয় না। এদেশে আইন কানুন আছে।

এদেশে আইন আছে, প্রয়োগ নাই। সব চলে সিস্টেমে। আমি সিস্টেম জানি।মাত্র চব্বিশ ঘণ্টা দেখার জন্য ওকে আমার সামনে থাকতে হবে ।

আপনি প্রচুর অর্থ বিত্তের অধিকারী? সর্বদিকে ক্ষমতা আছে আপনার?

আমি হালকা পিদিম। চোখ ধাঁধানো ওর শহর। কড়া আলোর রোশনাই আছে। শুনেছি ওর কর্তা ব্যাক্তিটি ডাকসাইটে পুলিশ অফিসার। ক্ষমতা আর দাপট দুইই আছে। তার ভয়ে বাঘে ছাগলে এক ঘাটে জল খায়। সক্কলে মানে।

আপনি  এতো খবর সংগ্রহ করলেন কী উপায়ে? আপনার কথা শুনতে শুনতে নিজেরও একটা পাগল পাগল দশা। আমার সব জট পাকালো। মনে হচ্ছে কথাগুলো আমাকেই বলছেন।

যদিও কাকতালীয় ঘটনা।

 

ধীরে ধীরে বুড়িটার মধ্যে স্নায়ুযুদ্ধ শুরু হয়ে গেল।

তুমি আচানক ভয় পেয়ে গেলে? তোমার কর্তা বুঝি পুলিশের লোক? তাহলে আমার শুভযোগ। ধরে নিই তুমিই সেই শ্রুতি। কিংবা, ধরো যদি তোমাকেই বলে থাকি,

তাইতো আমি এসব কী ভাবছি। আমি, আমাকেই বা বলবেন কেন? আমার লুকানো ছাপানো কোনো ঘটনা নাই।

সে তো জানিই। ভালো করে ভেবে দেখ, আমরা বাইরের চোখে শান্ত যে নদী দেখি তার গভীরে কত কি ঘটনা রটনা লুকানো তলানো থাকে।

থাকলেই বা আপনার কী? আপনার সব অনেক অন্যরকম। ঠিক এ ভাবে কাউকে বলা, আঘাত করা  অর্থহীন। মনেহচ্ছে না আপনি অপরাধী?

অন্যায় না করে অপরাধ, বুঝলাম না?

এইযে অনর্থক ওকে নিয়ে এতক্ষণ যে আলোচনা বললেন মনে হচ্ছে না আপনি অপরাধী। অপরাধ করতে নেমেছেন।

বোকার স্বর্গে বাস করো?

যেমন?

আমি কোনো অন্যায় যৌবনে করতে পারিনি। এমন প্রশ্ন জবাব অবান্তর। অপরাধী হবো কেন? মাত্র চব্বিশ ঘন্টা ধরে একজনকে দেখতে চাওয়া, গান শুনানো। এই মুহূর্তে যেমন আমরা। এটা অপরাধ সাব্যস্ত করবে কোন আদালত ? যতটুকু মনে পড়ে বইয়ে এই ধরনের অপরাধের  কোনো আইনী শাস্তির কথা লেখা নেই। তাছাড়া আমি তো পাগল, সণদ আছে। ধরতে ছুঁইতে পারবেনা।

আপনি আইনের ছাত্র? নাম কি?

যখন চিনলে না নাম দিয়ে কি হয় ? একসময় বলতে চেয়েছি, শুনোনি।

কে আপনি, আপনি, কে ?”

আমি কে? জীবন জমিনে কত কিছু দাফন করে চলতে হয় লোককে। পরিচয়টা দরকার ?

না থাক। আমি জেনেই বা কী করবো? আপনাকে চিনি না। কখনই দেখিওনি। আপনি আবারও খুব কাঁশছেন?

বুকের মাঝে কিছু কষ্ট থাকা ভালো।

তার চাইতে ভালো হয় পরের স্টেশনে আপনি যদি নেমে যান।

তোমার কথায় আমি নামবো কেন? রীতিমতন ফুল টিকিট কেটে উঠেছি। চব্বিশ ঘণ্টা আমি নেবই।

আপনি অসম্ভব রেগে উঠছেন। মানে আমি বলতে চেয়েছিলাম, আমরা নেমে যাই। আমার পরিচিত ডাক্তার আছে। আপনাকে ডাক্তার দেখিয়ে ফিরতি ট্রেন ধরিয়ে  তবেই আমি যাবো।

যাবার জন্যই তো এসেছো। আমার সঙ্গে গেলে তোমার কলঙ্ক হবে না?

কথাটা এঅব্দি মনে রেখেছেন। একটু আধটু কারো কাজে লাগলে কলঙ্ক হয় না। তাছাড়া আমার বাড়ি ঐদিকে। আপনার যে কোনো সাহায্যে লাগতে পারি। ওকে যা বলতে হয়, হাতে লিখে দিলে পৌঁছাতে পারব।

আমি তোমার সাহায্য নেব কেন?

আহা এটা সাহায্য না। সহযাত্রীর প্রতি সহানুভূতি, সহযোগিতা।

তোমার বদান্যতা ঔদার্যতা মনে রাখার মতো।

এখনও মাথা ঠান্ডা করলেন না। আপনাকে কিছুতেই হটানো যাবে না।

না। আর আমার ততদূর  যাওয়া পড়ছে না । এখানেই চব্বিশ ঘন্টা ,,,,,মাত্র মিনিট দুই বাকি। ঘড়ি দেখো। ভাগ্য সদয় হলে একবার দেখা পাবো। কিছু কথা বলার ছিল,,,, বলবো। দেখা পেলাম। কথা হলো। আজকে আমি প্রাণ ভরে আনন্দ বোধ করছি। ও দূরে চলে যাবে যাক। আমি আজও দূর হইনি। সেদিন অপেক্ষায় রেখে, ভালোবাসার কথাটা বলবো বলে বেরিয়েছিলাম পথে। সমাজ আমার কপাল ফাটিয়ে পাগলা গারদে রেখে দিল। ঐদিন খতম করে দিলে আমি ক্লোজ হয়ে যেতাম। তা না দিলো আরো ত্রিশ বছর। ত্রিশটা বছর ওহ খোদা ত্রিশ বছর। আরেক জনম। অনেক কষ্ট চেষ্টার পরে পালিয়ে এসেছি। ঠিকানা জোগাড় করলাম। শুনেছি ওকে প্রায়ই দেখা যায় এই পথে যাতায়াত করতে। একবার দেখার লোভ সামলাতে পারলাম না। দূর্বলতা গলা চিপে আছে। সময় শেষ জেনেও, একবার দেখার টানে ট্রেনে চেপে বসলাম । আমার ভালো দিন। ও জেনে গেল, কিছুটা হলেও তো আমি অপেক্ষা করেছিলাম। আমি নিশ্চিন্ত। অনেক বছর ঘুমাইনা। এইবার শান্তিতে ঘুমাবো “মন জ্যোৎস্না”,,,,,,,

বলে সে সীটের গায়ে ঠেস দিয়ে চক্ষু মুদে নিল।

এরই মধ্যে বসে বসেই ঘুমিয়ে গেল।

-কি বললে, *মন জ্যোৎস্না*, তুমি তুমি বাদল, বাদল না?, আমি  এতক্ষণে চিনেছি বাদল। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য আমি তোমায় বিন্দুমাত্র চিনিনি। তুমি তার খেয়াল করেছো। এ ভার কখনও কাটবে না। আমি নাহয় চিনলাম না। আমার কাছে এসেও পরিচয় দিলে না।কিসের বাঁধা ছিল। হাত দুটো ধরে একবার মন জ্যোৎস্না ডাকলে পারতে। এখনও এতো কাছে তুমি। একবার নাম ধরে ডেকে ওঠো, একবার হলেও কথা বলি,,,

সে ঘুমিয়ে পড়েছে ভেবে বুড়িটা নিজের গায়ের চাদরখানা খুলে মমতায় বুড়োর গায়ে দিল।

তারপর একা একা বকা ধরলো,” শেষটা শুনবে না। অন্তত এখন তুমি। বিশেষত দেখা যখন দিলে কৃপা করে। ভালোবাসো জানলে না বলার সাধ্য ছিল না। সর্বস্ব দিতাম তখুনি। সেদিন ক্লান্ত হয়ে একা ফিরে গেছি। অবিশ্বাসের জোর দলামুচ থেকেছে। তুমি পালিয়ে গেছ শুনে। পরে সবই বুঝেছি। আজ শোধবোধ হয়ে গেল। এইমাত্র তোমায় এতো কাছে পেয়ে। আমি সুখি, তুমিও সুখে থাকো।

ট্রেনটা চলছে হিসহিসিয়ে। সামনে তখনও কয়েকটি স্টেশন পড়ে।ট্রেনের হুইশেল, ঝাঁকানিতেও বুড়োর ঘুম ভাঙছে না। পথের মানুষ দেখেও বুড়ি এলোমেলো হলোনা। দূর দিগন্তেও হারিয়ে গেলনা।

দুপুর গড়ালো রাত্রি নামলো। দেখতে দেখতে শেষের স্টেশন পৌঁছেছে । চারিদিকে হৈ হল্লা। চৌকিদার, ফেরিওয়ালা মুটের হাঁকডাক। বগিতে দুই দেহ। কেউই টের পায়নি। শেষ যাত্রীও চলে গেছে ভেবে গার্ডের বাঁশি শুনে বড়ো ঝাঁটা হাতে উঠে এলো দুই ঝাড়ুদার। ঝপঝপিয়ে আওয়াজ তুলে ঐ মাথা থেকে ঝাঁড়ু দিতে দিতে এগিয়ে আসছে। বুড়োর ঘুম ভাঙলো না।

এ জাতীয় আরো সংবাদ