1. successrony@gmail.com : Mehedi Hasan Rony :
  2. rj.nazmul2500@gmail.com : Nazmul Hossain : Nazmul Hossain
বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২০, ০২:৩০ পূর্বাহ্ন

জননীর চিরকুট- শেষ পর্ব

সিফাত হালিম, ভিয়েনা, অস্ট্রিয়া।
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৬ জানুয়ারী, ২০২০
  • ২৪৩ বার

 

জগতের সব সম্পর্কের নাম, রঙ হয়না। এমন কিছু সম্পর্ক , যা মানুষ চোখের আড়াল থেকেও জীবনভর অন্তরে উপলব্ধিতে অনুভব করে।
মাতা – পুত্রের সম্পর্কের মধ্যে নাম রং নেই। সূর্য্য এবং দিনের সম্পর্কের ন্যায় অমোচনীয়, অমলিন।সূর্য উদয়াচলে এলে দিন হাসে। সূর্য অস্তাচলে গেলে, দিন কাঁদে।
প্রত্যেকটি মানুষের এই সম্পর্কে অশেষ দূর্বলতা থাকে।
তোকে চোখে না দেখে কষ্ট হচ্ছে। যেমন সূর্য্য ডুবলে দিন কাঁদতে থাকে। আরেক সূর্য্য ওঠার অপেক্ষায় থাকে। আমি সেরকম অবস্থায় পড়েছি। মনটা পড়ে রয়েছে তোর কাছে, ঘরে। মন অন্তর অহর্নিশ হু হু কাঁদছে । বুবন, তোকে ছাড়া মোটেও ভালো নেই আমি।

এখানে দ্রুত আরোগ্যের দরুন, দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা ও শুশ্রষার জন্য সপ্তাহ তিন ধরে পড়ে আছি।চারধারে অতি বিচিত্র সুউচ্চ মিশমিশে সবুজ গাছের সারির পাহাড়। আকাশের সাথে মিলে আছে মাথা। আর তার বুক চিরে রিহ্যাবসেন্ট্রুমের অবস্থান ।বনভূমি বিধৌত অঞ্চল। পাথর আর সবুজের মিলনে অদ্ভুত নিস্তব্ধ চৌদিক। মনোরম প্রাকৃতিক নৈসর্গিক সৌন্দর্যের মনোলোভা এক লীলাক্ষেত্র। এ জায়গায় সূর্য্যের আলো ঢোকে দেরীতে। সন্ধ্যাও নামে দ্রুত। তোকে আজকের ডাকেও প্রাকৃতিক দৃশ্যের একখানা কার্ড পাঠালাম। বিকালের ডাকে না গেলে কালকে যাবে নিশ্চয়ই।

আজ দুপুরের খাবারের পরে কোনো রুটিন নাই । খানিক বিশ্রাম নিয়ে বাইরে বের হবার পরিকল্পনা ছিল গতকাল থেকেই।আশেপাশে ঘোরাঘুরি করে একটু দেখবো। কিন্তু বিধি বাম,,,, যদিও দলের সঙ্গে যাই। সেখানে ডাক্তার, ট্রেইনার থাকে বরাবরই। সেটা ধরাবাঁধা নিয়মেই। নিয়মের বাইরে দেখা হয়নি।সাহসের ঘাটতি প্রবল।অপরিচিত জঙ্গলের পথ ঘাট। দ্রুত অন্ধকার নেমে আসে। তাছাড়া একলা একলা কখনো বের হইনি। এদিকে তেমন ঘর-বাড়ি নেই ।
একবার লিখেছিলাম, এক বাঙালি ভদ্রলোক আছেন ইসমাইল সাহেব। তিনি দল পাল্টে আমাদের দলে এখন। ভিয়েনায় চলে যাবেন শিগগিরই । কথা ছিল তাঁর গাইড দেবার। সাথে আরেকজন ও যাবে। নতুন এসেছে।
পাহাড় সমুদ্রে প্রকৃতির ভাব বোঝা দায়। সকাল থেকেই প্রকৃতি বৈরী। আমারও বিরুপ ভাগ্য। কাকভোর থেকে অবিরাম বর্ষণের ন্যায় বরফ পড়ছে। থামাথামির নাম নেই। বরফের কণা পেজা নরম তুলোর মতো। আকারে বড়ো। অল্প সময়ে ঢাকা পড়েছে রাস্তা, ক্ষেত খামারি ও বাড়ির টালির ছাতগুলো। এবং পাহাড় জঙ্গলের গাছ গাছালি।যেদিকে তাকাই সব সাদা। মনে হবে , দুধের সাগরের বুকে অসুস্থ, রুগ্ন কতগুলো মানুষ নিয়ে ভাসছে জাহাজ সদৃশ বিশালাকার রিহ্যাবসেন্ট্রুম। পাহাড়তলীর প্রত্যন্ত জনবিরল এলাকা। অথচ ইতোমধ্যে সরকারের লোকজন নেমে পড়েছে কাজে। রাস্তার হাঁটু অবধি বরফ সরাতে, বিশেষ যান নিয়ে ব্যস্ত।দুইটা গাড়ি অনবরত কাজ করছে। তাতে কি কুলোয়?ঠেলে নিয়ে একদিকে ফেলতে না ফেলতে অন্যদিকে ভরে ওঠে।

একলা কার কতক্ষণ ঘরে বসে থাকতে ভালো লাগে ?
বাইরের লম্বা বারান্দায় দাঁড়িয়ে ওদের বরফ কাটা দেখলাম একটু। যদিও এখানে একাকীত্ব বোধ করবার উপায় নেই। বিনোদনের অনেক ব্যবস্থা আছে।রোগীকে একভাবে না একভাবে ব্যস্ত রাখতে প্রকান্ড পাঠাগারে গাদাগাদি বইপত্র। যে যার মতো বেছে নাও। অনেকেই হাতের কাজ আঁকাআঁকি,সূঁচ সুতার কাজ করেন দেখেছি। আছে সুইমিং পুল, বিলিয়ার্ড, লং ও টেবিল টেনিস, দাবা এবং আরো অনেক রকম খেলার ব্যবস্থা।প্রতিটি রোগীর কক্ষে আছে সেন্ট্রুমের কর্তব্যরত ডাক্তারের সাথে প্রয়োজনে যোগাযোগের টেলিফোন এবং দেখার জন্য টেলিভিশন।
আমি গিয়ে পাঠাগারে ঢুকলাম।
বিকেল গড়াচ্ছে। পাঠাগার থেকে বেরিয়ে দেখি,বরফ নেই।রাস্তা অনেকটাই পরিষ্কার। কিন্তু আকাশের মুখ ভার। নেমে এসেছে অনেক নীচে। গুড়গুড় করে মেঘ ডাকছে।আবার যে কোনো মুহূর্তে বরফ নামবে অথবা বৃষ্টি হবে ।

ঘরে না গিয়ে একটুক্ষণ বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকি। আকাশের সব বরফ এখন পাহাড়ের চূঁড়ায়। গাছের মাথায় মাথায়। বরফে ঢাকা গাছগুলো জবুথবু বুড়ো মানুষের মতো দেখায়।প্রকৃতি বড়ো বিচিত্র। গত চিঠিতে লিখেছি,শীতের প্রারম্ভে এসব গাছের করুণ দশা।সমস্ত সবুজ মরে গিয়ে পাতাগুলো হরিদ্রা হয়ে ঝরে আর বাকল ফেটে ফেটে চৌচির হয়ে পড়ে তলায়। সেই গাছগুলো এখন বরফে মুড়ে সাদা বুড়োর হাল হয়েছে । বারান্দার সামনে গাড়ির পার্ক। বেশী ভিড় হয় সাপ্তাহিক ছুটির দুই দিনে। সেখানে একটাও গাড়ি থেমে নেই।

কিছুক্ষণ খ্যান্ত দিয়ে, সন্ধ্যেবেলা সত্যি সত্যি ঝুম বৃষ্টি নামা ধরলো। সঙ্গে বরফ। বিশ্রী রকম ঠান্ডা। সূঁচের মতো বেঁধে।
গরম চুল্লি আছে সেন্ট্রুমের সবখানেই।চব্বিশ ঘণ্টা ধরে চলে। বারান্দা গ্লাসে ঢাকা। ঠান্ডার প্রকোপ কম হয় না । আমি আপাদমস্তক গরম কাপড়ে মোড়া। মাথার টুপি হাতের দস্তানা সব উলের। অথচ বারান্দায় দাঁড়িয়ে হি হি কাঁপছিলাম।
আজকে এখানে সাক্ষাৎপ্রার্থী রোগীর স্বজনদের চাপ কম ছিল । যারা এসেছিলেন ইতোমধ্যে তারা গন্তব্যের দিকে। নৈশভাগের ডাক্তার কর্মচারী বাদে রিহ্যাবসেন্ট্রুম জনশূন্য প্রায়। রোগীরা যে যার কক্ষে আশ্রয় নিয়েছেন। তাদের *টু*শব্দ শোনা যাচ্ছে না। বারান্দায় করিডোরে কোথাও কেউ নেই। বাইরে ভীষণ ঝড়ো হাওয়া দিয়ে বরফ বৃষ্টি, ভেতরে পিনপতন স্তব্ধতা।নিস্তব্ধতার কাছে হার মেনেছে শব্দেরা।থমকে গেছে যেন মহাকাল এখানে। কবরখানার মতন।হঠাৎ করেই চমকে উঠলাম।বারান্দায় অত আলোর মধ্যে দাঁড়িয়েও আমার ভালো লাগলো না।

২৮ মার্চ ২০১০
ভেবেছিলাম এখানকার সেবাশুস্রষায় আমি ভালো হয়ে উঠবো। আর মাস খানেক পরে ছাড়া পবো। সম্পূর্ণ সুস্থ কি আর হয়? কিছু তো হবে। কিন্তু আমার ভাবনার বিপরীতে সহস্র অনিশ্চয়তার ঢেউ আছড়ে ভাঙছে দেহের ভেতর। সপ্তাহ না গড়াতেই আশঙ্কা সত্যে রূপ নিল। শরীর খারাপের দিকে গেল। এখন আর হার্টের না। মাথায়।
এমন অনুভব আগে হয়নি। সেটা ব্যথা ঠিক না। অন্যরকম অস্বস্তি। আমার চিকিৎসা, পড়ালেখা, খাওয়া-দাওয়া, গোসল সব বন্ধ। যাইহোক, তোকে ছাড়া কখনই ভালো থাকিনে আমি। ভালো থাকা যায় না। আমি মোটেও ভালো নেই বাবা । হাজার বছরের কষ্ট বুকে। নিশাসটা আটকে আছে। এরপর যদি আর না লেখা হয়,তোর দেখা যদি না পাই, আগেভাগে কিছু জানিয়ে দিই।এইই আমার সারা জীবনের সঞ্চয়। এখন একলা পড়তে পারবি না। কুতুব অথবা রনিকে দিয়ে পড়িয়ে শুনিস। চিঠিগুলো আপাততঃ রেখে দিস।যেদিন একা একা পড়ার যোগ্যতা অর্জন করবি, সেদিনই মর্ম উপলব্ধি হবে ,তখনই বুঝতে পারবি মা কি লিখেছিলো।

১৭ এপ্রিল ২০১০
শরীরটা দারুণ খারাপ যাচ্ছে। লিখতে পারি নাই। যে প্রসঙ্গে এসে গত চিঠি শেষ করেছিলাম। উল্লেখ্য না করলেই না,অল্প বয়সী ছেলে মেয়েরা মনে করে, তারা যা বুঝেছে তা আর কেউই বোঝেনা।খেয়াল করে শোন, জীবনটা অবহেলার জিনিস না। একবারই আসে। তবে কোনও না কোনো অনুপ্রেরণার দরকার হয় জীবনে। আমার কথাগুলো জীবনভর মনে রাখবি। একদিন না একদিন জীবনের উন্নতি, চলার ক্ষেত্র তৈরি অর্থাৎ সফলতার জন্য তোর কাজ দেবে আমি বিশ্বাস করি। বাকিটা আল্লাহ ভরসা ।

তোকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না, এ ধরনের কথাবার্তা আমি কখনোই ভাবিনা বুবন। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, ব্যারিস্টার, নামী দামী অমুক তমুক ইত্যাদি হতেই হবে অনেক অভিভাবক এসব সন্তানাদির ওপর চাপিয়ে দেন। আমার ওসব বাহুল্য নেই। তুই জীবনে কি হবি, সেটা একান্ত তোর ব্যাপার। আমি যতটুকু বুঝছি, তোর সামর্থ্য ও মেধার মধ্যে হয়তো ভালো কিছুই হবি। হয়তো বললাম এই কারণে, আমি কি আর ভূত-ভবিষ্যত পড়তে পারি? না বলা উচিৎ ?
সাধারণ একটা মেয়ে আমি। বেশী স্বপ্ন টপ্ন দেখিনা। তা বলে তোকে নিয়ে আমার স্বপ্ন দেখার কমতি নেই। সে স্বপ্ন গড়ে দেবার দায়িত্ব তোর। অনেক ডিগ্রীধারী না হলেও সত্যিকারের মানুষের মতো মানুষ হবি এটা আশাকরি।
প্রত্যেকটা মা সন্তান জন্মের পর থেকেই এমন একটা প্রত্যাশা রাখেন মনে। সর্বপ্রথম যার আদর্শ ও দৃষ্টান্তের কথা তোকে বলি, তিনি তোর বাপি (Dad)। ওর মতো সৎ, সত্যবাদী চরিত্রের, নম্র, সহজ সরল, কঠোর পরিশ্রমী লোকের অভাব আছে। দুনিয়ার সকল লোক সম্মুখে আগাতে চায়। সকলের নাম, খ্যাতি ও টাকার লোভ আছে। কিন্তু কুতুব অন্য ধাতুর গড়া। সে আমার জীবনের মানব না মহামানব। আস্হা এবং ভরসা করার মতো মানুষ।আমার ঠিকানা। আমি তাকে যা দিয়েছি বা দিতে পারি, সে বাবদে আমাকে তার কাছে সহস্র গুণ বেশি দামী করে রেখেছে । আমি কৃতজ্ঞ।
কুতুবের মতো হলেই হয়।আমরা তাতে খুশি। যদিও নির্ভেজাল চরম সত্য, সংসারে মাকে আদর্শ করে প্রত্যেকটি সন্তান গড়ে ওঠে। এরই জন্য বলা হয়ে থাকে , Mother is the best Teacher and Home is the first School. যাইহোক আমি তোকে মানুষ হতে বলেছি ।

তোর সামর্থ্য ও মেধা অনুযায়ী নিজের জীবনের একটা লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ঠিক করে নিবি। দিকভ্রষ্ট হলে তীরে ওঠা দুষ্কর।উদ্দেশ্যহীন জীবন সফলতা পায়না। তাই উদ্দেশ্য এবং লক্ষ্য নির্ধারণ করে নিস। আমার বিশ্বাস তুই পারবি ইনশাআল্লাহ-তায়ালা । আমিও পেরেছি।
সময় ও চরিত্র অতি মূল্যবান সম্পদ। একে মুঠোয় পুরে কাজে লাগাতে হয়।বর্তমানের বিস্তৃতি অনেক। তোর বর্তমান মানে তোর সমস্তটা জীবন। তোর প্রতিটি মূল্যবান মুহূর্তের অস্তিত্ব। গোটা ভবিষ্যত। ভবিষ্যতের কথা ভেবে মুহূর্তগুলোর যদি মূল্যায়ন না করিস, নিজেই ফাঁকিতে পড়ে যাবি। বর্তমান একবার বেরিয়ে গেলে, সারাজীবন অর্জিত সমস্ত সম্পত্তির বিনিময়েও ফেরত পাওয়া যায় না। পরিশ্রমী ও স্বাবলম্বী হতে হবে।অন্য কারোর উপরে নির্ভরশীল হতে নেই। হলেই তার কপালে আমারই মত দুঃখ। তাছাড়া মেধা ও সম্পদ কোনো কাজে আসে না। মেধা কাজে না খাটালে অর্থের যোগান আপনিই বন্ধ। আর অর্থ যোগান না থাকলে রাজাও ভিখারি।

সবসময় নিজের সার্থকতা সম্পর্কে আত্মসচেতনতা,আস্হা ও দৃঢ়তা থাকা দরকার। হ্যাঁ, আমি পারবো। আমাকে পারতেই হবে, এই বোধ, দৃঢ়তা সবসময় মনে থাকা চাই। চেষ্টা না থাকলে কখনো উন্নয়ন সম্ভব না।
জ্ঞানের কোনো বিকল্প নেই। এজন্য বই পড়তে হবে। বইএর এক জাদুকরী শক্তি আছে। নানান শাস্ত্রের বই যেটা পূরণ করে । মনের ক্ষুধা মেটায়। বাইরে পাওয়া যায় না এমন, অনেক বিশ্ব বিদ্যালয়ের পাঠাগার গুলোয় সেসব গুরুত্বপূর্ণ বই-পুস্তক পাওয়া যায়। ক্রয় অথবা বসে পড়া সম্ভব না হলে, জিরক্স করে নিস। আমি যেমনি করতাম। এখন আরো উন্নত প্রযুক্তি বেরিয়েছে। ঘরে বসে সহজে অনলাইনে বই পড়া যাচ্ছে। অবসর মুহূর্তে জ্ঞান অর্জনের জন্য নানান দেশ ঘুরে দেখা, তাদের ভাষা সংস্কৃতির সাথে কিছুটা পরিচিত হওয়া অত্যন্ত জরুরি।এতে করেও জ্ঞানের পরিধি আরও বৃদ্ধি ও পরিপক্ক হয়।
নিজের সামর্থ্যের মধ্যে নিজের মূল্যায়ন করতে হবে। পাছে লোক কিছু বলে এ ভাবনা মাথায় রাখলে অযথা সময় নষ্ট। তাতে পিছিয়ে পড়বার সম্ভাবনা বেশি।হতাশ হবি না। আমি ভেতরে বাইরের মানুষের কথা শুনে মাঝে মাঝে পিছিয়ে যেতাম, ভেঙে পড়েছি। আবার শক্ত হতাম। পৃথিবীর অধিকাংশ ভীষণ কুচ্ছিত। আপনজনেরাই বেশি করে। মানুষ সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত, লাঞ্ছিত এবং নিগৃহীত হয় আপনজন দ্বারা। সেসব ভুলতে না পারাটা নির্মম কষ্টের । ওরা তোকে ভিখ্ দেবেনা বাবন। কিন্তু ধিক্ দেবে। ওরা তোকে ভাঙতে সমালোচনা করবে।ষড়যন্ত্রের জাল বিছাবে। কখনই হার মানবি না। হতাশা বা বিষাদাক্রান্ত হবি না।নিজের সঙ্গে বোঝাপড়াটা করে নিস। নিজেই সব সমাধান খুঁজে পাবি। যখন যা করেছিস সেটাই ভালো মনে মানবি।তার জন্য আফসোস কিংবা মন খারাপ করবি না। সবচেয়ে ভালো হবে প্রতিকূল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার ক্ষমতা অর্জন করা । আমাদের প্রত্যেকের জীবনে খারাপ সময় যায়। যারা জীবনে বড়ো কিছু করবার জন্য পৃথিবীতে এসেছে, তাদের আরও বেশী খারাপ সময় যায়। জীবনে চলার পথ এত সহজ না। অত্যন্ত পিচ্ছিল। চলার পথ কেউ কাউকে তৈরি করে দেয় না। সে পথ সহজ, সুগম করে এগুবার দায়িত্ব নিজেরি উপর বর্তায় ।
আবেগ প্রাধান্য দেওয়া যাবে না। ভাবাবেগে মানুষ অনেক ক্ষেত্রে ভুল করে বসে। যে কোনো বিষয়ে বিচার বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উত্তম। আমি জানি, অত সূক্ষ্ম চুল চেরা বিশ্লেষণে জীবন চলে না। তবে অনেক অপ্রয়োজনীয় কষ্ট থেকে বেঁচে যাবার জন্য ভাবাবেগ প্রশ্রয় না দেওয়ায় মঙ্গল।
অতিরিক্ত বা অতিরঞ্জিত কখনো হিতৈষী বন্ধু না। উদাহরণ স্বরূপ মুখের কথা, জেদ-ক্রোধ এবং বিলাসিতা মানুষকে শেষ করে দেবার জন্য অতি শক্তিশালী খারাপ অস্ত্র। এসব বশে রাখা উচিত। অতি ক্ষুদ্র সূঁচের খোঁচা যেমন , ছয় ফুটি লম্বা একজন মানুষের মৃত্যু ঘটাতে পারে। আমাজানের মতো বিশাল বনভূমিকে উজাড় করে দিতে সামান্য একটা দেশলাই কাঠি যথেষ্ট । তাই জেদ ক্রোধ বশে রাখা দরকার। কথাবার্তা হবে হিসেব করে।

অহেতুক বিলাসিতার দরুন বাজে খরচ আমার একেবারেই না পছন্দ। এ প্রসঙ্গে ওয়ারেন বাফেটের বিখ্যাত উক্তি, “আপনার যা প্রয়োজন নেই, তা যদি আপনি ক্রয় করেন তবে খুব শীঘ্রই আপনার প্রয়োজনে তা বিক্রি করতে হবে।”যথেষ্ট যুক্তি সঙ্গত কথা।কাজেই অপ্রয়োজনীয়তা পরিহার করে চলবি। পরিষ্কার পরিপাটি পরিচ্ছন্ন পোশাক,সাদামাটা জীবন যাপন শ্রেয় । মনে রাখিস, তোর একবারের অহেতুক বিলাসিতার টাকায় হয়তো কারো না কারো পরিবারের সারা মাসের খরচ চলছে।

যতটা সম্ভব মানুষের কল্যাণে নিজের জ্ঞান ও সামর্থ্য অনুযায়ী অর্থ কড়ি ব্যয় করিস। সবচেয়ে বড়ো যে কথাটা, তোর নিজের কাজের প্রতি মনোযোগী, দায়িত্ব ও কর্তব্যের প্রতি সচেতন থাকবি। যে কোনো পেশায় এমনই মজা , একবার নাম হয়ে গেলে টাকা তখন ইনসিডেন্টাল হয়ে যায়। তোকে টাকা খুঁজতে হবে না।টাকা এমনিতেই আসে । শুধুমাত্র পেশা না। জীবনে কোনো ক্ষেত্রে কখনই অসৎ আর মিথ্যাবাদী হবিনা। এ আমার আদেশ। ওসবের ভিত্তি বড় দূর্বল কাঁচা। দূর্বল মাটি ও ফাউন্ডেশনের ওপরে যত বড়ো বিল্ডিং দাঁড় করা হয় না কেন? পতন বা ধ্বংস অনিবার্য।
নিজের ধর্ম, মাতৃভাষা, ও সংস্কৃতির প্রতি মার মতো শ্রদ্ধা সম্মান করিস। নামাজ কালাম আদায় করবি নিয়মিত। নামাজ কালাম শেখার এখানে অনেক সুযোগ আছে। যে ভাবে পারিস টেনে হিঁছড়ে আমাদের ভাষাটা একটু একটু করে রপ্ত করতে যত্ন নিস। বাংলা পড়তে হবে। লিখতে, বলতে পারবি।এ তোর সকল অস্তিত্বের মূল । তোর শেঁকড়ের বন্ধন।তোর মায়ের ভাষা। যে সমাজে আমরা আছি। বসবাস করছি। তুই জন্মেছিস। সেই সমাজের প্রয়োজনে অন্যের ভাষার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা আছে। অন্যের ভাষায় শিক্ষা – দীক্ষা, গড়গড়িয়ে কথা বলতে পারা, সেটা গর্বের কোনো বিষয় না। প্রয়োজনের বিষয়। প্রত্যেকটি মানুষের জীবনেই প্রয়োজনের আধিক্য আছে।
সফল হতে পারার আরও অনেক দৃষ্টান্ত রয়েছে । মাথায় কাজ করে না তেমন।
জীবন যখন বয়সের পলির ভারে নিমজ্জিত, অবসন্ন হয়। সেই সময় আসবার বহু পূর্বে থেকেই অর্থাৎ আমার তরুণী বয়সে আমি সর্বনেশে রোগের ভারে আক্রান্ত হয়েছি। সবসময়ই শঙ্কা হঠাৎই কোনো খারাপ ঘটনা ঘটে যায়। কুতুব প্রাথমিক ধাক্কা সামলে উঠতে সময় নেবে। এই সময়টুকু, যেখানে ইচ্ছা থাকতে পারিস। লন্ডনে সোমা, নিউইয়র্কে ছোট মামা, টরেন্টোতে দাদু আর সিডনিতে আমার খোকা ভাই রইলো। কোনো সমস্যা হবে না আশাকরি। কোথাও যদি জায়গা না হয়, পৃথিবী অনেক বড়ো। এখানে সৃষ্টিকর্তা পিঁপড়ের জন্য জায়গা এবং আহারের সংস্হান করে রেখেছেন। তুই তো মানুষ। তোরও একটা ঠিকানা জুটে যাবে। নইলে এতিমখানা আছে কি জন্য??আমার দোয়া থাকলো সবসময়। কুতুব একটু সংযত হলেই তোকে নিয়ে আসবে।
ছোট্ট একটা বক্স আমি লকারে রাখলাম। চাবি শিথানের ড্রয়ারে আছে।তোর একটা বয়সের জন্য অপেক্ষা করছিলাম।কিন্তু মানুষের জীবন, বলা তো যায় না। জন্ম মৃত্যু সহ সমস্ত শব্দ অনিশ্চিত। কুতুব আর তোর সোমা আন্টি জানে। কি করতে হবে। লন্ডন থেকে সোমা এলে, সোমার সাথে গিয়ে , বাক্সটা প্রাপককে বুঝিয়ে দিস।প্রাপক তোকে দেখলেই চিনতে পারবে আশাকরি। আমার কিছুটা ছাপ আছে তোর মধ্যে। চিনতে না পারার কথা না।
বাক্সে বন্দী করা যৌতুক প্রত্যাশী কাঙাল, ভিক্ষুকের জন্য, আমার ক্ষমা ভিক্ষা আছে। ১৪+৫ তার পরের আরও +৬ বছরের প্রবঞ্চনার হিসাবে ক্ষমা ভিক্ষা। সে যেন আমার ক্ষমা ভিক্ষার জ্বালাময় যন্ত্রণা বুকে নিয়ে, ধুকে ধুকে বেঁচে থাকে অনন্ত কাল।

বুবন,
বাইরে প্রচন্ড ঝড় উঠেছে। যদি সেই ঝড়ের দাপটে ছিটকে পড়ি।তোর মাকে মনে থাকবে? তোকে আমি ভালোবাসি সবসময় এবং সারা জীবনের জন্য।

এ জাতীয় আরো সংবাদ